অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আইপিওর ভূমিকা যত্সামান্য

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শেয়ারবাজারে আসা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওগুলোর খুব বেশি ভূমিকা নেই। গত ৩৯ বছরে এসব আইপিওর যথাযথ ভূমিকা থাকলে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি যেমন উন্নত হতো, তেমনি দেশের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরো বাড়ত।

এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, এর পেছনে শেয়ারবাজারে সুশাসনের অভাব, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে অন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং নানা সময়ে বাজারে ঘটে যাওয়া ধসই দায়ী।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজারে আসা আইপিও নিয়ে নানা গুঞ্জন উঠেছে। বাজারে নতুন নতুন কোম্পানি আনার জন্য তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়। সহজে তালিকাভুক্তির জন্য বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে আসা কোম্পানিগুলোর যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি নিয়েও সমালোচনার অন্ত ছিল না। এছাড়া, কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলোর সঠিক বিচার না হওয়ায় বাজারের প্রতি আস্থাহীনতা বেড়ে যায়।

পুঁজিবাজারকে বলা হয় অর্থনীতির ব্যারোমিটার। অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে এই বাজার খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেনি। ‘দ্য ইফেক্টস অব আইপিও ফিন্যান্সিং অ্যান্ড মানিটারি পলিসি অন ইকোনমিক গ্রোথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। গত ৩৯ বছরের তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষণাপত্রটি তৈরি করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুবর্ণ বড়ুয়া তার গবেষণা সম্পর্কে ইত্তেফাককে বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে গত ৩৯ বছরে (১৯৮১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত) প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) যে অর্থায়ন হয়েছে তার অর্থনৈতিক প্রভাব তেমন নেই। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে এটা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। স্বল্পমেয়াদে অল্প কিছু প্রভাব আছে। যদিও এটার উলটোটা ঘটার কথা ছিল।

অর্থনীতিতে আইপিওর অর্থ প্রভাব রাখতে পারার কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনি তিনটি কারণের কথা বলেছেন। সেগুলো হলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে হারে রেজিস্টার্ড কোম্পানি হয়েছে সে হারে শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলো লিস্টেড হয়নি। এখন শেয়ারবাজারে মাত্র ৩৬৫টি কোম্পানি তালিকভুক্ত। তবে দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অনেক। ফলে, নন-লিস্টেড কোম্পানিগুলোই দেশের অর্থনীতিতে বেশি প্রভাব রাখছে।

দ্বিতীয়ত, গত ৩৯ বছরে আইপিওর মাধ্যমে ১৩৩ বিলিয়ন টাকা লেনদেন হয়েছে। এটা জিডিপি বা ব্যাংক খাতের তুলনায় অনেক কম। তৃতীয়ত, আলোচ্য সময়ে আইপিও থেকে যতটা টাকা উত্তোলন করা হয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার হয় কি না সে বিষয়ে বিরাট প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ঐ যথাযথ ব্যবহার না করে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় বেশি। যথাযথ ব্যবহার হলে কর্মসংস্থান বাড়তো এবং ভোক্তা তৈরি হতো।

যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে কমিটি:

এদিকে, গতকাল সোমবার বিএসইসি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের যৌক্তিক কাট—অফ প্রাইস বা মূল্য নির্ধারণে কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। সংস্থাটির এক নির্দেশনায় বলা হয়, এখন থেকে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের দরপ্রস্তাবের জন্য কমিটি গঠন ও তাদের সুপারিশ বিবেচনায় নিতে হবে।

এতে বলা হয়, যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের জন্য কমপক্ষে দুই সদস্যের দর প্রস্তাবকারী কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি শেয়ার মূল্যায়ন বিশ্লেষণ শেষে বিডিংয়ে অংশগ্রহণের সুপারিশ করবে। এই কমিটিই শেয়ারের পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ করে দেবে। কোন পদ্ধতিতে এটি করা হবে—সে বিষয়েও গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতি অনুসরণের জন্য বলা হয়েছে। যেমন—নিট অ্যাসেট ভ্যালু পদ্ধতি, ইল্ড পদ্ধতি ও ফেয়ার ভ্যালু পদ্ধতি। বিডিংয়ের মূল্য নির্ধারণের প্রাক্কালে কোম্পানির আর্থিক, প্রযুক্তিগত, ব্যবস্থাপনাগত, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, মালিকানা ও সুশাসন ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপে না পড়ে সততার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নিবে কমিটি। তবে কমিটির সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ইস্যুয়ার কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার বা সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে প্রকাশ করা যাবে না।

প্রস্তাবিত দরের মূল্যায়ন রিপোর্ট বিডিং শেষ হওয়ার দুই কার্যদিবসের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ বিডিংয়ের তথ্য সাত কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেবে। এক্ষেত্রে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের দর মূল্যায়নে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য পেলে, তা কমিশনকে জানানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

Comments