ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সাংবাদিকের পক্ষে ক্র্যাব!

ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সাংবাদিকের পক্ষে ক্র্যাব!

ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সাংবাদিকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। আজ তারা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কাল সোমবার তারা ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সাংবাদিক মাহবুব আলম লাভলুর পক্ষে মানববন্ধন করবে। লাভলুর বিরুদ্ধে গতকাল ঢাকার চকবাজার থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন জনৈক আশিকুর রহমান। উল্লেখ্য মাহবুব আলম লাভলু রাজধানীর পল্টনের প্রীতম-জামান টাওয়ারের ক্রিস্টাল-১৬৮ নামের অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসা করত। পল্টন থানার তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ আছে। এই কারণে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি থেকে চাকরি চলে যায় তার। ক্র্যাব সূত্র জানায়, লাভলুর ক্যাসিনো ব্যবসার  সহযোগী সাংবাদিকরাই তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ।

মামলায় যা ছিল:

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করা হয়েছে ক্যাসিনো ব্যবসায়ী মাহবুব আলম লাবলুর বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার চকবাজার থানায় মামলাটি করেন মো. আশিকুর রহমান নামে এক ব্যক্তি।

চকবাজার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, সুনাম ক্ষুণ্ন করা, বিভ্রান্তি ছড়াতে উদ্দেশ্যে, অপপ্রচার ও মিথ্যা জানা সত্ত্বেও লাবলু তার ‘শুদ্ধ সত্য’ নামীয় ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। অনুমতি ব্যতিত তথ্য সংগ্রহ পূর্বক ইউটিউবে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য ধারণ করা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে প্রচার-প্রচারণা ও সহায়তা করার অপরাধ।

মামলার বাদী মো. আশিকুর রহমান জানান, গত বুধবার আমি নিজে ভিডিওগুলি দেখি এবং একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আহত, অপমানিত এবং সংক্ষুব্ধ হই। তাই পরদিন বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় ক্ষতি সাধনকারী উক্ত ব্যক্তিকে (মাহবুব আলম লাবলু) ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করি।

কে এই লাভলু?

লাবলু ক্রিষ্টাল ১৮৬ ডট কম নামে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছিল অনলাইন ব্যবসার জন্য। পল্টন প্রীতম জামান টাওয়ারে আলিশান অফিসও নিয়েছিল। তার ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর ক্রমিক নম্বর -২৯৪৮। লাইসেন্সে পাতার নম্বর-০২০৯০১৪৮। ট্রেডলাইসেন্সে তার পাসপোর্ট সাইজের ছবিও রয়েছে। তখন এই ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সাংবাদিক লাভলু ছিল ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। আর এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে টানা দুইবছর চালিয়েছেন অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসা। বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনোর জনক হিসাবেই সে পরিচিত।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তদন্তে এ অনলাইন জুয়ার আসরের খবর বেরিয়ে আসছে। এ জুয়ার আসর বন্ধ করার জন্য ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন থানা পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র বরাবর লিখিত আবেদন (যার স্বারক নম্বর-১২৪৭) করা হয়েছিল। সূত্র পল্টন মডেল থানার জিডি নম্বর-১৩১২।

তারপরে অনলাইন জুয়ার ব্যবসা করা সেলিম প্রধান এখন জেলে আছে, কিন্তু বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাহবুব আলম লাভলু। পুলিশ তাকে একবার আটক করলেও পরে আবার ছেড়ে দেয়। অথচ এই ক্যাসিনো ব্যবসার কারণে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করে। তাকে পুলিশ কেন ছেড়ে দেয় এই নিয়ে তখন ডেইলি ষ্টার, সংবাদ, প্রথম আলোসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে বলা বলা হয় ডিএমপির তৎকালীন উর্ধতন একজন পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশে লাভলুকে গ্রেফতারের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ছেড়ে দেয়া হয়, কিন্তু ওই কর্মকর্তা কোনো তদবিরের কথা অস্বীকার করেন।
রহস্য সেখানেই, এরপর লাভলু কিভাবে ছাড়া পেলেন। যেখানে যুবলীগ নেতা সম্রাট,খালেদরা জেলে আছেন। অথচ বিএনপির রাজনীতি করা সত্বেও বর্তমানে অঢেল সম্পদের মালিক মাহবুব আলম লাভলু এখন বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও লাভলু ছিলেন বিএনপি-জামাত জোট সমর্থিত তাবিথ আওয়ালের মিডিয়া ম্যানেজার। ছাত্রজীবনে লাভলু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের ক্যাডার ছিলেন।সেখানেও ভর্তি হয়েছিলেন জাল সার্টিফিকেট দিয়ে। অবাক হয়েছিলেন তার মানিকগঞ্জের ঘিওরের তার গ্রামের লোকজন। কারণ যে ছেলে এইচএসসি পাসই করেননি, সে কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো ।

লাভলুর উত্থান:

হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০ বিঘা জায়গা দখল করার মধ্য দিয়েই লাভলুর উত্থান। তখন তিনি জনকণ্ঠ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেন। গত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় দলীয় ও সাংবাদিকতার প্রভাব দিয়ে ওই হিন্দু পরিবারগুলোকে দেশ ছাড়া করেন। তার ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনি। অথচ লাভলুর বাবা ফেরি করে গ্রামে গ্রামে হাড়িপাতিল বিক্রি করতো। তার বৌ নার্সের চাকুরী করতো। তার এই ভূমি দস্যুতার কাহিনী মানিকগঞ্জের ঘিওর থানার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের দুলন্ডী গ্রামের সবার মুখে মুখে। ওই হিন্দু পরিবারগুলো এরপর কয়েকবার দেশে এসেও মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো সুরাহা করতে পারেননি। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কাছে যাবার হুমকি দিলে লাভলু তাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দেশ থেকে বিদায় করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সেই জায়গায় লাভলু গড়ে তুলেছেন প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল অট্টালিকা ও বাগান বাড়ি। যেখানে প্রায়ই বসে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মনোরঞ্জনের আসর।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঢাকা উদ্যানে তার রয়েছে এক সুরম্য প্রাসাদ। জায়গা সহ যার আনুমানিক মূল্য ১২ কোটি টাকা। এই পাঁচ তলা বাসার একটি ফ্লোরে প্রতিরাতেই বসে মদ ও জুয়ার আসর । এলাকা বাসি জানান, সন্ধ্যা হলেই সেখানে গাড়ি আর নারীর দেখা পাওয়া যায়, কিন্তু ভয়ে কেউ কিছু বলেন না। ওই বাসার তিনতলার একসময়ের বাসিন্দা এনামুল কবির জানান, একবার এই বেলেল্লাপনার প্রতিবাদ করায় তাকে মাস্তান দিয়ে পিটিয়ে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। তিনি থানায় গিয়েই কোনো প্রতিকার পাননি।

মিরপুরের পশ্চিম শেওড়া পাড়া শামীম সরণিতে ৫৩০/১ নম্বর বাসা অপ্সরা পান্থশালায় তার রয়েছে আরেকটি ফ্ল্যাট। যেখানে যুব মহিলালীগ নেত্রী পাপিয়া ভাড়া নিয়ে নারী ব্যবসা করতেন। পরে ভবন মালিক সমিতির প্রতিবাদের মুখে লাভলু তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দিতে বাধ্যহন। স্থানীয় কাউন্সিলরকেও সেখানে জড়িত হয়ে তাদেরকে বাসা থেকে বের করতে হয়।

চাকুরীচুত্য হবার পর লাভলু রাজধানীর পান্থপথে একটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানে খুলেন মিডিয়া হাউস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই মিডিয়া হাউসের আড়ালে সেখানে প্রতিরাতেই বসে মদ মেয়ে জুয়ার আসর। এই আসরের অধিকাংশই মিডিয়ার লোকজন। সবই চলছে পুলিশের নাকের ডগায়।

তার ঢাকা শহরে আলিফ পরিবহণে রয়েছে ৭টি বাস,
1. D.M. BA-11-7021, 2. D.M. BA-11-7985, 3. D.M. BA-11-7986, 4. D.M. BA-11-8011, 5. D.M. BA-11-8012, 6. D.M. BA-11-8013, 7. D.M. BA-13-1200
চড়েন নিত্য নতুন মডেলের গাড়ি। প্রায়ই সাড়ে তিনকোটি টাকা মূল্যের একটি ভি-৮ গাড়িতে তাকে দেখা যায়। মানিকগঞ্জের ঘিওরে রয়েছে একটি গরুর খামার, যেখানে ব্যয় করেছেন ২ কোটি টাকার উপরে।

৪০ হাজার টাকা বেতনের একজন সাংবাদিক কিভাবে এতো অঢেল সম্পদের মালিক হলেন? একজন ফেরিওয়ালার ছেলে লাভলু রাজধানীতে সাংবাদিকতার আড়ালে কিভাবে দুই বছর নির্বিঘ্নে ক্যাসিনো ব্যবসা করেছেন? এসবই যেন কেবলই রহস্য!

 

Comments