খেলাপি হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে! ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি

খেলাপি হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে! ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, করোনার কারণে কিস্তি প্রদানে শৈথিল্য থাকলেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি। আর পদ্ধতিগত জটিলতা ও পরিস্থিতির শিকার হয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তারা খেলাপি হলেও ইচ্ছেকৃত খেলাপিরা বহাল তবিয়তেই থাকছেন। বরং তাদের জন্য রয়েছে নানা ছাড়, নানা কৌশলে সময়ক্ষেপণ ছাড়াও নানাবিধ সুবিধা। ব্যাংক ব্যবস্থাপনার প্রশ্রয়েই ইচ্ছেকৃত ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। তাদের জন্য নানা সুবিধা থাকে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে। কিন্তু প্রকৃত উদ্যোক্তারা অপছন্দের পাত্র হয়ে যান তাদের কাছে। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, প্রভাবশালী এসব ইচ্ছেকৃত খেলাপিরা ঋণ পরিশোধে বছরের পর বছর সময় পেয়েছেন। কেউ কেউ আছেন যারা সময় নিয়েও কিস্তির টাকা ঠিক সময়ে পরিশোধ করেননি। কেউ কেউ বারংবার ঋণ পুনঃতপশিল করেছেন। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যার প্রতি খুশি থাকে, তিনি সর্বোচ্চ সুবিধাই পেয়ে যান।

অন্যদিকে, যারা ‘খুশি’ করতে পারেন না কিংবা প্রভাব দেখাতে পারেন না, তাদের দশা ত্রাহি। এমনকি নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রভাবশালীদের পরোক্ষ হাত থাকে। এখানেও যেন একটা ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করে। নানা ছলছুতোয় নীতির শৈথিল্য থেকে শুরু করে অভিনব পন্থা অবলম্বন করা হয়। সব সরকারের আমলেই এরা সুবিধাভোগী তালিকার শীর্ষে থাকে। এদের কেউ কেউ আবার নীতিনির্ধারকদেরও কাছের মানুষ হয়ে যান।

সূত্রমতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে নানা ছাড় দিলেও মূলত কিছু মুখ্য সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। ফলে, নতুন উদ্যোগ যেমন উত্সাহিত হচ্ছে না তেমনি পুরোনো উদ্যোক্তাদেরও নাভিশ্বাস চরমে। গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কারণে শিল্প-কারখানাগুলোর উত্পাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটছে। তদুপরি, পণ্য পরিবহন জটিলতা, বিভিন্ন স্থানে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে হয়রানিসহ নানাবিধ জটিলতায় রপ্তানি বাজারও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ না হয়ে উপায় কী! তাতে ব্যাংকে খেলাপি হওয়াই স্বাভাবিক। উপরন্তু, নীতিগ্রহণেরও সমস্যা রয়েছে। নীতির ধারাবাহিকতা বজায় না থাকা, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নীতিমালার শিথিলতা, গোষ্ঠীবিশেষের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রভৃতি কারণে সত্ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের ক্ষেত্রে ব্যাংক-কাস্টমার সম্পর্কও গুরুত্ব পাচ্ছে না। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পক গুরুত্ব পাচ্ছে বিশেষ গোষ্ঠীর বেলায়। ব্যাংকিং সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যমূল্য কমছে। তদুপরি, ডলারের দামও বেড়েছে। একটি প্রকল্পের বিপরীতে যখন ঋণ প্রদান করা হয়, তখন ডলারের যে মূল্য থাকে পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে যায়। বর্তমানে ডলারের মূল্য ৮৬ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম মজুরি, কাঁচামালসহ আনুষঙ্গিক খরচও বেড়ে যায়। যা সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো বাড়িয়ে দেয়। ফলে, তুলনামূলক কম মুনাফায় বাড়তি খরচের বহর মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে যদি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা না থাকায় কারখানাগুলোপুরোদমে উত্পাদনে যেতে পারছে না।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিচালনা বোর্ডের যোগসাজশে নিজেদের পছন্দের কিছু গ্রাহককেই বেছে নেয়। যারা সব সময়ই সুবিধা পেয়ে থাকেন। এদের সুদ হার কমানো থেকে শুরু করে ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময় দেওয়া হয়। এখন কোভিডের সময়। কোভিডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দোহাই দিয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাঁধে ভর করে মূলত বড় সুবিধা ইচ্ছেকৃত খেলাপিরাই নিয়ে নিয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সুবিধা লুটে নিয়েছে বলেও সূত্রগুলো মনে করছে। এদের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন হয়ে যাবে।

এদিকে, ব্যাংকের অসহযোগিতায় অনেক গ্রাহক কারখানা চালু রাখতেও পারছে না। যারা পরিস্থিতির শিকার এমন গ্রাহকরা ব্যাংকের কাছে কোনো সুবিধাই পায় না। বরং তিরস্কারই মেলে তাদের। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঐ ব্যাংকের এক গ্রাহককে হুমকি দিয়ে কারখানা বিক্রি করে দিতে বলেন। অথচ গত প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঐ গ্রাহক ব্যাংকের টাকা শোধ করে চলেছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রকৃত উদ্যোক্তারা প্রায়শই মোকাবিলা করেন। তাদের করার কিছুই থাকে না।

Comments