তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে শক্তিমান অর্থনীতি— বাংলাদেশ যেন ফিনিক্স পাখি

তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে শক্তিমান অর্থনীতি— বাংলাদেশ যেন ফিনিক্স পাখি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন বলছে, মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। অথচ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই দেশটিতে একেবারে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। একসময় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামেও ডাকা হয়েছে। পাঁচ দশকের মাথায় এসে অর্থনীতিতে সেই বাংলাদেশ আজ ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেছে।

ফিনিক্স পাখি যেমন নিজের ছাইয়ের স্তূপ থেকেই পুনর্জন্ম লাভ করে, বাংলাদেশের অর্থনীতির এই উত্থানকে ঠিক সেই পুনর্জাগরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন দুই দশক ধরে বিবিসি’র নয়াদিল্লি ব্যুরোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া স্বনামধন্য সাংবাদিক মার্ক টালি। প্রভাবশালী ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসে এক নিবন্ধে এভাবেই বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করেছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে এসেছিলেন মার্ক টালি। সেই স্মৃতি এখনো জাগরুক তার। টালি লিখেছেন, একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তাণ্ডব আমি দেখেছি। ঢাকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহীর পথে যেতে যেতে দেখেছি, সেনাবাহিনী গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে কয়লা বানিয়ে ফেলেছে। স্বাধীনতার আড়াই বছর পরই দেশটি দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। আর এরপরই শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং সেনা কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যেকার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পথও উন্মুক্ত হয়।

টালি বলছেন, বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুধু তাই নয়, সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া দেশটি আন্তর্জাতিক মহলের অবজ্ঞারও শিকার হয়েছে। ওই সময়কার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তো বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র সঙ্গেই তুলনা করেছিলেন।

সেইসব দিন পেরিয়ে এসে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির সামনে বাংলাদেশ বর্তমানে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন টালি। তিনি বলেন, গত ২০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলভাবে বাড়ছে। এই উন্নয়নের গতিধারা এতটাই ধারাবাহিক যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে রীতিমতো ‘উন্নয়নের মডেল’ হিসেবেই অভিহিত করছে।

তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এমন শক্তিশালী অবস্থানের মধ্যেও ‍দুর্বল দিকগুলোকেও চিহ্নিত করতে ভোলেননি মার্ক টালি। তিনি লিখেছেন, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো অতি দরিদ্র। সস্তা পোশাক রফতানি আর প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর এই দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর মধ্যেই বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে, করোনা মহামারির কারণে এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৫ শতাংশ কম হবে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতও এখন খুব প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানের পেছনে ‍দুইটি বিষয়ের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন টালি— বিদেশি সহায়তা এবং বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কার্যক্রম। তিনি বলছেন, এই দুইটি বিষয়ই ভারতের থেকে একদম আলাদা। এ ক্ষেত্রে তার নিজের অনুমানকেও বাংলাদেশ ভুল প্রমাণ করেছে বলে মনে করছেন তিনি।

টালি লিখেছেন, প্রথমত, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া পরামর্শগুলো গ্রহণে বাংলাদেশ অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। নব্বইয়ের দশকে ‘অ্যাডিকটেড টু এইড’ তথ্যচিত্রে আমি বলেছিলাম, বিদেশি সহায়তার বিপুল ভাণ্ডার উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আজ পেছন ফিরে দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের সেই সঙ্গীন অর্থনৈতিক অবস্থায় রাজনৈতিক দলাদলি ভুলে দেশের জন্য দাতাগোষ্ঠীর পরামর্শকে সাদরে গ্রহণ করার বিষয়টিই বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল। বেসরকারিকরণকে দরিদ্রদের স্বার্থবিরোধী মনে করা হতো। তা সত্ত্বেও ঢাকা বেসরকারিকরণকে স্বাগত জানিয়েছে, যেখানে ভারত এখনো এই নীতির বিষয়ে অনেক বেশি দ্বিধায় রয়েছে।

এনজিও কার্যক্রমের বিষয়টি তুলে ধরে টালি লিখেছেন, ভারত যেটা করতে পারেনি, বাংলাদেশ সেখানে দেশের উন্নয়নে এনজিওগুলোতে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দিয়েছে। এর চমৎকার একটি উদাহরণ হলো ব্র্যাক। ইকোনমিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক বর্তমানে সারাবিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় দাতব্য সংস্থা। বিশ্বের ৪৫টি দেশে ব্র্যাকের কর্মসূচি অনুসরণ করে চরম দারিদ্র্য মনিটরিং করা হয়ে থাকে।

তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে শক্তিমান অর্থনীতি— বাংলাদেশ যেন ফিনিক্স পাখি
বাংলাদেশকে নিয়ে লেখা হিন্দুস্থান টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদন

আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ‘সুসম্পর্ক’ নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। মার্ক টালি লিখেছেন, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং পরে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভারতের কাছে বাংলাদেশ বিক্রি করে দেওয়ার এক ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে গতিধারা বাংলাদেশে রয়েছে, সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেই রাজনৈতিক শক্তিমত্তা দিয়েছে যা দিয়ে তিনি তার ভারতের সঙ্গেকার সম্পর্ক নিয়ে ওঠা অভিযোগও অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বরং এই দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দুই দেশই পরস্পরের মধ্যে অনিষ্পন্ন অনেক বিষয়ই সমাধানের সুযোগ পেয়েছে এবং কাজে লাগিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বেশকিছু ইস্যুর নিষ্পত্তির উদাহরণও তুলে ধরেছেন মার্ক টালি। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ ছিল দীর্ঘ দিনের। হাসিনা-মোদি সম্পর্কের সূত্র ধরে সেই বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাস ও রেল যোগাযোগ গভীর হয়েছে। বাংলাদেশের আখাউড়া ও ভারতের আগরতলার মধ্যে ১২ কিলোমিটার রেল সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যেকার এই চমৎকার সম্পর্কের মধ্যেও অবশ্য ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক বলে মনে করছেন মার্ক টালি।

দু’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দ্য ডিপ্লোম্যাটে আশফাক জামান লিখেছিলেন, বাংলাদেশই দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন নেতৃত্ব। বিশ্ব বাংলাদেশকে সেই স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রেখেছিলেন তিনি। হিন্দুস্তান টাইমসের মতামত দিতে গিয়ে মার্ক টালিও বাংলাদেশের সেই অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্রই তুলে ধরেছেন। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে রেখে গেছে, সে অবস্থা থেকে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাই ফিনিক্স পাখির পুনর্জাগরণেরই বাস্তব উদাহরণ— এমনটিই মত মার্ক টালির।

Comments