নীরবে নির্যাতন সহ্য : আইন প্রবীণদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে?

নীরবে নির্যাতন সহ্য : আইন প্রবীণদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে?

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার এক বৃদ্ধ দম্পতি প্রতিনিয়ত শারীরিক নিগ্রহের শিকার হতেন। সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নিজ সন্তানের হাতেই নিগ্রহের শিকার হতেন বৃদ্ধ দম্পতি।

নির্যাতনের মাত্রা সইতে না পেরে এক পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শরণাপন্ন হন বৃদ্ধ পিতা।

তার মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন এবং বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যান এবং নিশ্চিত করেন যে তারা যাতে শারীরিক নিগ্রহের স্বীকার না হয়।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, বিষয়টি দেখভাল করার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

“ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যকে বলেছিলাম প্রতি মাসে তাদের সম্পর্কে আমাকে জানাতে। এরপর থেকে সে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের দ্বারা নিগৃহীত হবার কথা আর শুনিনি,” বলেন জাকির হোসেন।

ময়মনসিংহের এই ঘটনার মতো আরো অনেক নির্যাতনের খবর প্রতিনিয়ত সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়। এই নির্যাতন শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নির্যাতনের মাত্রাও অনেক ক্ষেত্রে বেশ প্রবল। বিশ্বজুড়ে প্রবীনদের এধরণের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা এবং সুরক্ষা দেবার জন্য ২০১২ সাল থেকে প্রতিবছর ১৫ই জুন ‘ওয়ার্ল্ড এলডার অ্যাবিউজ অ্যাওয়ারনেস ডে’ ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী বয়স্ক ভাতা পায় প্রায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ। প্রতিমাসে একজন ব্যক্তিকে ৫০০ টাকা ভাতা দেয়া হয়। সরকারের এই পরিসংখ্যানে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে দরিদ্র প্রবীনদের সংখ্যা বেশ বড়।

সরকারি হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ প্রবীণ জনগোষ্ঠি – বিশেষ করে যাদের বয়স সত্তরের বেশি।

তবে প্রবীনদের নিগ্রহের কাহিনী শুধু দরিদ্র পরিবারে নয়, সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারেও অহরহ শোনা যাচ্ছে।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে অতি প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যাদের বয়স ৮০ বছরের বেশি। বাংলাদেশেও এ সংখ্যা বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক এএসএম আতিকুর রহমান গত প্রায় চার দশক যাবত বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নানা গবেষণা করছেন।

অধ্যাপক রহমান বলেন, “বার্ধক্য এমন একটা বিষয় যেটা কেউ বুঝতে চায় না, জানতে চায় না, শুনতে চায় না। প্রবীণদের কষ্টের কোন সীমা নেই, বিশেষ করে নারী প্রবীণদের ক্ষেত্রে এটি আরে বেশি।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই প্রবীণদের অবজ্ঞা এবং নিগ্রহ করার বিষয়টি বিরাজমান।

অধ্যাপক রহমান বলেন, শহুরে উচ্চবিত্ত সমাজে প্রবীণদের অবহেলা এবং বিচ্ছিন্ন করে দেবার প্রবণতা দেখা যায়। তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে বেশি।

মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের মধ্যে অবহেলার ধরণ ভিন্নরকম। মধ্যবিত্ত পরিবারে একজন প্রবীণকে দেখাশুনা এবং সেবা করার জন্য যে ধরণের জনবল এবং আর্থিক সামর্থ্য দরকার সেটি অনেকের থাকে না। অধ্যাপক রহমান বলেন, এর ফলে ইচ্ছে কিংবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের কাছে অবহেলার শিকার হচ্ছেন প্রবীণরা।

আইন কী বলছে?

বৃদ্ধ অবস্থায় পিতা-মাতাকে সন্তানের কাছ থেকে সুরক্ষা দেবার জন্য ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণয়ন করে সরকার। পিতা-মাতার ভরন-পোষণ না করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে। এই আইনে বলা হয়েছে, কোন সন্তান তার পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। পিতা-মাতার জন্য ভরন-পোষণ এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে এই আইনে।

যদি সন্তানরা এসব দায়িত্ব পালন না করে তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সেক্ষেত্রে একলক্ষ টাকা জরিমানা অথবা তিনমাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী পিতা-মাতা আইনের আশ্রয় নিতে পারবে। তবে মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা বলছেন, গ্রাম পর্যায়ে বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানদের দ্বারা বেশি নিগ্রহের শিকার হন। তবে শহরাঞ্চলেও এসব ঘটনা একেবারে কম নয়।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, গ্রামাঞ্চলে অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতা বঞ্চনা ও নিগ্রহের শিকার হলেও তারা সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে চান না।

এ কারণে আইনটির প্রয়োগ নেই বলে উল্লেখ করেন মি. হোসেন।

তবে অধ্যাপক আতিকুর রহমান বলেন, এই আইনটি কোন শাস্তিমূলক আইন নয়, এটা আপোষমূলক আইন। সেজন্য এখানে আপোষ এবং সমঝোতা করার বিধান রাখা হয়েছে।বিবিসি বাংলা

Comments