বিশ্বনবির হাসি-খুশি ও রসিকতার ধরন কেমন ছিল?

হাসি-খুশি মন সুস্থ থাকার জন্য খুবই প্রয়োজন। হাসি-খুশি ও রসিকতার অনুমোদনও রয়েছে ইসলামে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই কখনও কখনও রসিকতা করেছেন। হাদিসের একাধিক বর্ণনায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি রসিকতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে তাতে মিথ্যার লেশমাত্র নেই। শুধু মানসিক প্রশান্তি ও চিত্তবিনোদন এবং প্রশংসা করার জন্যই তিনি সবার সঙ্গে রসিকতা করেছেন, যা এ উম্মতের জন্য উত্তম শিক্ষা।

জ্ঞানীদের ভাষায়, আনন্দ ও চিত্তবিনোদন মানুষকে জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে সহায়তা করে এবং এর মাধ্যমে পার্থিব বিষয়ে অনেক সাফল্য পাওয়া যায়। তাছাড়া মনোবিজ্ঞানীরাও মানুষের সুস্থতার জন্য আনন্দ ও চিত্তবিনোদনকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন।

হাদিসের বর্ণনায় রসিকতা

> হজরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন একবার এক ব্যক্তি এসে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একটা ‘বাহনের জন্তু’ চায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আমরা তোমাকে একটা উটনির বাচ্চা দেব। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি উটনির বাচ্চা দিয়ে কী করব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আরে উটেরা সব উটনিদেরই বাচ্চা নয় কি? (আবু দাউদ)

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, ‘হে দুই কানওয়ালা!’ এ কথায় যেমন মিথ্যা নেই। তাতে আবার রয়েছে আনন্দ ও বিনোদন। কারণ মানুষের কান তো দুটিই হয়। তা সত্ত্বেও যখন কাউকে ‘দুই কানওয়ালা’ সম্বোধন করে ডাকা হয়; স্বভাবতই ওই ব্যক্তি প্রথম ডাকেই চমকে যাবে।

আর এটি যে ছিল রসিকতা বা কৌতুক; তা সে পরে বুঝে আনন্দ পাবে। কারণ এ ডাকে তাকে প্রশংসিত ও গুণান্বিত করা হয়েছে। ‘হে দু’কানওয়ালা!’ মানে হলো সে কোনো কিছু নিখুঁত শোনে এবং সঠিকভাবে বুঝতে পারে। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর ক্ষেত্রে যা ছিল সত্য কথার অপূর্ব রসিতকা।

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ জাতীয় রসিকতার আরও অনেক ঘটনা আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরও একটি চমৎকার রসিকতার ঘটনা রয়েছে; যা না বললেই নয়। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, জাহির নামক এক (গ্রাম্যবাসী) সাহাবি গ্রামের বিভিন্ন জিনিস প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হাদিয়া দিতেন।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাকে শহরের বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বিদায় করতেন। তিনি বলতেন, ‘জাহির হল আমাদের গ্রাম, আমরা তার নগর।’ তিনি তাঁকে খুবই ভালবাসতেন।

একদিনের ঘটনা’

হজরত জাহির রাদিয়াল্লাহু আনহু বাজারে তার পণ্য বিক্রি করছিলেন। এ অবস্থায় প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পেছন থেকে প্রিয় সাহাবিকে জড়িয়ে ধরলেন।

হজরত জাহির রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি (বিরক্ত হয়ে) বলে উঠলেন, এই কে? আমাকে ছেড়ে দাও। তারপর পেছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন তিনি যে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

(সাহাবি জাহির) কালবিলম্ব না করে নিজেকে আরও পেছন দিকে নিয়ে যেতে থাকলেন। এভাবে একদম সেঁটে গেলেন প্রিয় নবির পরম প্রিয় বুকের সঙ্গে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁকে বুকে ধরে রাখলেন।

তারপর রসিকতার মাত্রা যোগ করলেন। তিনি বললেন, কে কিনবে? এই গোলামটি বিক্রি করব।

হজরত জাহির রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখতে সুশ্রী ছিলেন না। তিনি বলে উঠলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দাম সস্তা হবে। আমাকে কেউ কিনতে চাবে না।

প্রিয় নবী (সান্ত্বনা দিলেন এবং আসল কথাটিই) বললেন, কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি সস্তা নও। তাঁর কাছে তোমার দাম অনেক বেশি। (শামায়েলে তিরমিজি)

তবে রসিকতার নামে কাউকে হেয় করা উপহাস করা যাবে না। আবার কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মানুষকে হেয় বা উপহাস করতে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘হে মুমিনগণ! পুরুষগণ যেন অপর পুরুষদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে, তারা) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। এবং নারীগণও যেন অপর নারীদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যে নারীদেরকে উপহাস করা হচ্ছে) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যকে কটাক্ষ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। (এসব ফাসেকি কাজ। আর) ঈমানের পর ফাসেকি নামযুক্ত হওয়া বড় খারাপ কথা। যারা এসব থেকে বিরত না হবে তারাই জালেম বা অত্যাচারী।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১১)

রসিকতার ধরন

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও রসিকতা করতেন, যেমনটা আগে বলা হয়েছে, কিন্তু তাঁর রসিকতায় মিথ্যার কোনো ছোঁয়া ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ সম্পর্কে প্রশ্নই করেই বসলেন-

ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যে আমাদের সাথে রসিকতা করেন (অথচ এক হাদীসে আপনি আমাদেরকে এটা করতে নিষেধ করেছেন)?

তিনি বললেন- হ্যাঁ, তবে আমি (রসিকতার নামে মিথ্যা বলি না) কেবল সত্যই বলি। (তিরমিজি)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক বৃদ্ধা (নারী সাহাবি) এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে জান্নাত দান করেন।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (রসিকতা করে) বলেন, ‘হে অমুকের মা! কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এই কথা শুনে বৃদ্ধা (নারী সাহাবি) কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাচ্ছিলেন।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন, তাকে গিয়ে বল- বরং সে যুবতী ও চিরকুমারী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শামায়েলে তিরমিজি)

শিশুদের সঙ্গে বিশ্বনবির রসিকতা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট ছোট শিশুদের সঙ্গেও রসিকতা ও মজা করতেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সঙ্গে অবাধে মিশতেন। এমনকি তিনি আমার ছোট ভাইকে কৌতুক করে বলতেন- ‘আবু উমায়ের! কী করে নুগাইর।’ অর্থাৎ তোমার নুগাইর পাখিটার কী অবস্থা?

আবু উমায়েরের খেলার পাখিটা মারা গেলে সে অনেক কষ্ট পায়। তাই তার মনোরঞ্জনের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পাখিটির অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করেন। এভাবে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাস তার সঙ্গে কথা বলার কারণে তার দুঃখ দূর হয়, সে আনন্দ পায়।’ (শামায়েলে তিরমিজি)

সাবধান থাকতে হবে-

শিশুদের সঙ্গে রসিকতা করতে গিয়ে কোনোভাবেই মিথ্যা কিংবা এমন কোনো রসিকতা করা যাবে না; যার দ্বারা বাচ্চারা ভুল শিক্ষা পায়। অনেকে আবার শিশুদের কিছু দেয়ার কথা বলে লোভ দেখিয়ে না দিয়ে ধোঁকার আশ্রয় নেয়। এমনটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেননা ইসলামে ধোঁকা বা প্রতারণা হারাম বা নিষিদ্ধ। আর এর মাধ্যমে শিশুরা অনৈতিকার দিকে ধাবিত হয়। হাদিসে এসেছে-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শিশুকে ডাকল, এদিকে এসো! (কিছু দেয়ার জন্য) অতঃপর তা দিল না, তবে তা মিথ্যা।’ (মুসনাদে আহমাদ)

মনে রাখা জরুরি

হাসি, মজা বা রসিকতা হতে হবে সম্পূর্ণ মিথ্যাহীন, ধোঁকা ও প্রতারণামুক্ত। অনেককে দেখা যায়,কমেডি করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা জাতি-গোষ্ঠীকে ট্রল করে বসে। যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

তবে কৌতুক কিংবা রসিকতা মানেই মিথ্যা নয়; কেননা প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো মিথ্যা রসিকতাপূর্ণ কৌতুক করতেন না। বরং অবমাননাকর কৌতুকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরক্তিবোধ করতেন এবং নিষেধ করতেন। এ বিষয়ে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সতর্কতামূলক সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। হাদিসে এসেছে-

> হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ইচ্ছাকৃত বা কৌতুক করে কোনোভাবেই ‘মিথ্যা’ গ্রহণযোগ্য হয় না।’ (ইবনে মাজাহ)

> অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, মানুষকে হাসানোর জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।’ (আবু দাউদ)

> একদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাসির ছলে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জনৈক ব্যক্তির চাল-চলন নকল করে দেখালেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাতে বিরক্তি প্রকাশ করেন।’ (তিরমিজি)

তাই মিথ্যা, বিরক্তিকর রসিকতা ও কৌতুক একেবারেই নিষেধ। মিথ্যা সব পাপের জননী। তা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়। আর এই পাপই মানুষকে জাহান্নামে ঠেলে দিবে। কেননা হাদিসে এসেছে- ‘তোমরা মিথ্যা পরিহার করো। কেননা মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে। আর পাপ মানুষকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়।’ (তিরমিজি)

মুমিন মুসলমানের উচিত, মিথ্যা গর্হিত যে কোনো কৌতুক ও রসিকতা পরিহার করা। সত্য এবং বিনোদনমূলক রসিকতায় কোনো দোষ নেই। এমনটি যেন না হয় যে, ইসলাম সমর্থিত সুন্দর একটা জিনিস আপনার জন্য জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে হাসি-খুশি ও রসিকাতর ক্ষেত্রেও সঠিক পথের ওপর থাকার তাওফিক দান করুন। সব সময় মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রতারণামূলক যে কোনো বিনোদন থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Comments