‘বিড়ম্বিত’ বিএনপির শতাধিক নেতা ,পদ-পদবি না থাকায়

‘বিড়ম্বিত’ বিএনপির শতাধিক নেতা ,পদ-পদবি না থাকায়

পদ-পদবি না থাকায় ‘বিড়ম্বনার শিকার’ হতে হচ্ছে বিএনপির কয়েক শতাধিক নেতাকে। পরিচয় সংকটে ভুগছেন তারা। সাবেক এমপি ও মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের হেভিওয়েট নেতা রয়েছেন এ তালিকায়। এমনকি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে যোগ দেওয়া নেতাদেরও বিএনপিতে এ পর্যন্ত কোনো পদ-পদবি দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

পদ-পদবি না থাকায় সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে মনে করছেন এই নেতারা। অনেকে নিরুৎসাহিত হয়ে দলীয় কর্মসূচি থেকেও নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছেন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বহাল রাখার প্রবণতার কারণে বিএনপিতে একদিকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে নেতাকর্মীদের পদায়নও করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে একমাত্র জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কমিটি বাদে অন্য সবগুলোই মেয়াদোত্তীর্ণ। সম্প্রতি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলার নেতাদের সঙ্গে হাইকমান্ডের ধারাবাহিক বৈঠকে বিশেষত ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। এ প্রক্রিয়ায় সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। এটা দলের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে এর আগে ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদের দলে সক্রিয় করে তোলা হয়। এ সময় ১২ জন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সরব হন। কিন্তু এরপর গত প্রায় তিন বছরেও এসব হেভিওয়েট নেতাদের কোনো পদ-পদবি নিশ্চিত করতে পারেনি বিএনপি। এর ফলে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে বিব্রত হতে হচ্ছে তাদের, দলীয় কার্যক্রমেও পিছিয়ে পড়ছেন তারা।

এমন নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক মন্ত্রী আলমগীর কবির, সাবেক হুইপ আবু ইউসুফ মো. খলিলুর রহমান, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (জিএম সিরাজ), সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, জহির উদ্দিন স্বপন, নজির হোসেন, ডা. জিয়াউল হক, আতাউর রহমান আঙ্গুর, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ও শহিদুল আলম তালুকদার।

তাদের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন- আলমগীর কবির (নওগাঁ-৬), খলিলুর রহমান (জয়পুরহাট-২), জিএম সিরাজ (বগুড়া-৫), সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল (নরসিংদী-৪), নজির হোসেন (সুনামগঞ্জ-১) ও জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১)। তবে তারা কেউই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় শূন্য ঘোষিত (বগুড়া-৬) আসনে উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে জিএম সিরাজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এসব নেতার আগে সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে দলে ফিরিয়ে আনা হয় এবং তাকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়।

দলে সক্রিয় করে তোলা এসব নেতার মধ্যে একমাত্র জিএম সিরাজকে বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে দলে ফিরিয়ে আনা নেতাদের অনেকে যেমন দলীয় মনোনয়ন পান, তেমনি কেউ কেউ মনোনয়নবঞ্চিতও হন। এ নিয়ে তারা নতুন করে ক্ষুব্ধ হলেও তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

দলে পদ-পদবি নেই এমন দু’জন গুরুত্বপূর্ণ বিএনপি নেতা ময়মনসিংহ জেলার সাবেক এমপি দেলোয়ার হোসেন খান দুলু ও সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি। গোলাম মাওলা রনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। নির্বাচনের পর দলীয় ফোরামে তাকে আর সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি। দলের কোনো কার্যক্রমে তাকে ডাকা হয় না, এমনকি নির্বাচনী আসনে দল পুনর্গঠনেও তার কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সময় দলে ফিরিয়ে আনা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য চৌধুরী তানবীর আহমেদ সিদ্দিকীকে। তাকে গাজীপুর-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয় তখন। কিন্তু নির্বাচনের পর তাকে দলের কোনো কার্যক্রমে দেখা যায়নি। বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মেয়ে রিটা রহমান ২০ দলীয় জোটসঙ্গী ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের প্রধান ছিলেন। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রংপুর-৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমার দিন তিনি নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এখন পর্যন্ত দলে কোনো পদ-পদবি হয়নি তার। দলীয় কোনো কর্মসূচিতেও তাকে দেখা যায় না।

একইভাবে বিএনপির আগের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী, সাবেক এমপি শাহ মুহাম্মদ আবুল হোসাইনসহ নব্বই দশকের ছাত্রদল ও যুবদলের অসংখ্য নেতাকর্মী রয়েছেন, যারা দলে বা সংগঠনে পদ-পদবিহীন। সাইদ ইকবাল মাহমুদ টিটো, আসাদুজ্জামান পলাশ, আহসানউদ্দিন খান শিপন, শেখ আব্দুল হালিম খোকন, সাইফুল ইসলাম, জাবেদ হাসান স্বাধীন, সাহাবুদ্দিন মুন্না, তরিকুল ইসলাম টিটু, এম মুকিত ভূঁইয়া লিঙ্কন, আনিসুর রহমান রানাসহ আরও অনেক নেতাই রয়েছেন এ তালিকায়। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাইদ ইকবাল মাহমুদ টিটোদের পদায়ন করা হবে এমন সিদ্ধান্ত থাকলেও প্রতিপক্ষের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না বলে জানান যুবদলের নেতারা।

ছাত্রদলের রাজীব-আকরাম কমিটির পাঁচ শতাধিক নেতাও এ পর্যন্ত নতুন কোনো পদ-পদবি পাননি। ছাত্রদলের জুয়েল-হাবিব কমিটিরও অনেকে আছেন, যারা নতুন কোনো পদ-পদবি পাননি। অভিযোগ, সময়মতো অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির কাউন্সিল না হওয়ায় তারা এ অবস্থার শিকার।

এদিকে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের মধ্যে ১২ জন রয়েছেন বহিস্কৃতদের তালিকায়। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ থাকার পরও তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি হাইকমান্ড। রাগে, ক্ষোভে আর অভিমানে শুধু রাজনীতি নয়, দেশ ছেড়ে চলে গেছেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাহাবুদ্দিন লাল্টু। তাকেও দলে সক্রিয় করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবশ্য তিনিও আর ফিরে আসতে চান না বলে জানা গেছে।

নেতারা জানান, নিরপেক্ষ সরকারের অধীন ছাড়া আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ও আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির নেতারা। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় জেলা, মহানগর, পৌর বিএনপিসহ কেন্দ্রীয় অঙ্গসংগঠনে এসব নেতাকে পদায়ন করা হবে। এর পরও যারা পদহীন থাকবেন, তাদের মূল দলে যুক্ত করা হবে।

সাবেক এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, পরিচয় অবশ্যই একটা ম্যাটার। আমি উপজেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু অন্য অনেকের এ পরিচয়ও নেই। যোগ্যতা অনুসারে দায়িত্ব দেওয়া হলে আরও বেশি কিছু দিতে পারব আমি। জাতীয় পর্যায়ে কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আসাদুজ্জামান পলাশ বলেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শকে ধারণ করে পথ চলতে শুরু করেছি। জিয়া পরিবারের নির্দেশনাই আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। এটাই আমাদের পরিচয়।

Comments