মহান মে দিবস আজ

মহান মে দিবস আজ

করোনা সংক্রমণে গোটা বিশ্ব প্রায় বিপর্যস্ত। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এ বছরও এমন সময়েই মে দিবস উপস্থিত, যখন অনেক শ্রমিক কর্মহীন। আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনায় সৃষ্ট অর্থনেতিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী শ্রম খাতের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বিরাট অংশ রয়েছে জীবিকার ঝুঁকিতে। আমরা জানি, বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা দৈনিক মজুরি বা কর্মঘণ্টার বিভিন্ন কাজ করেন, তারাও রয়েছেন ঝুঁকিতে। শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রকোপে হাজার হাজার শ্রমিকের আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। অনেকের আয় নেমেছে শূন্যের কোঠায়। আমরা জানি, শ্রমজীবী কিংবা দিনমজুর অনেকেই লকডাউন পরিস্থিতিতে ঘরে থেকে খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। দেশে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের কারণে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়লেও প্রতিবছর যে ২৫ থেকে ৩০ লাখ তরুণ-তরুণী নতুন করে শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে, তাদের কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া গতিশীল নয়; করোনার অভিঘাতে তা আরও থমকে গেছে। বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত বলে সংকট আরও বেড়েছে। আমরা জানি, ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হে মার্কেটে ধর্মঘটরত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মদান ও রক্তদানের মাধ্যমে জন্ম হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস।

মে দিবস মেহনতী মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের আনন্দ ও সংহতি প্রকাশের দিন। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস তথা মে দিবস পালিত হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ অতীতের তুলনায় অনেকটাই উন্নত এবং তা আরও শ্রেয় করার প্রয়াসও অব্যাহত। মে দিবসের পথ ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের অধিকার বিশেষ করে মজুরি, কাজের পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা- এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অনস্বীকার্য, গত দু’দশকে বিশ্বায়নের ফলে অর্থনেতিক গতিশীলতা-সমৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি এও সত্য, বেড়েছে বৈষম্য ও বঞ্চনাও। তবে আশার কথা হলো, শিল্প-শ্রমিকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে শিশুশ্রমও। কিন্তু শ্রম আইন আরও যুগোপযোগী ও শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ ও দৈনিক কাজের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা বর্তমান সভ্যতার পরিপন্থি। আমরা মনে করি, সমাজের অন্যান্য পেশার মানুষের মতো শ্রমিকদেরও মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেণি হিসেবেই দেখা ও মূল্যায়ন করা উচিত। মেহনতী মানুষের জীবনযাপনের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। করোনাদুর্যোগ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারকে আরও বিস্তৃত ও পরিকল্পিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। যারা বাস্তবতার কঠিন কশাঘাতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তারা যেন দুর্যোগ-উত্তর পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় মানবিকতার প্রসারিত হাতের স্পর্শ পান- আমরা এ আহ্বানও জানাই। আমরা যেভাবে করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, সে রকমই সবাই সবার পাশে দাঁড়িয়ে যূথবদ্ধ প্রয়াসে যদি আবার নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করতে সক্ষম হই, তাহলে নিশ্চয় আঁধার কাটবে। বিপন্ন-বিপর্যস্তরা দাঁড়াতে পারবে মাথা তুলে।

লকডাউন-উত্তর কিংবা দুর্যোগ পরিস্থিতি কেটে গেলেও এর মন্দ প্রভাব উৎপাদনমুখী শিল্প ও শ্রমিকদের ওপর যাতে যতটা সম্ভব কম পড়ে, সরকার ও শিল্প মালিকদের সেই চেষ্টা চালাতে হবে সম্মিলিতভাবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্তদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ আমরা সরকারকে দিই। অনস্বীকার্য, শ্রমিক শ্রেণি যে কোনো দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা যেমন উৎপাদন ব্যবস্থার মূল সহায়ক শক্তি, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেরও অন্যতম কারিগর। তাদের বঞ্চনা ঘোচাতেই হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদানসহ তাদের সঙ্গে সদাচরণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতেই হবে। তাদের জন্য ন্যায়সঙ্গত করণীয় অসম্পন্ন কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করাও জরুরি বলে আমরা মনে করি। বিদ্যমান করোনাদুর্যোগে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব আরও বেড়েছে- তাও যেন আমরা স্মরণে রাখি। আমরা এও মনে করি, স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা মেনে পোশাকশিল্পের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানও খোলার ব্যাপারে সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শ্রমিক-মালিক ঐক্যেই সমৃদ্ধি। আমরা বাংলাদেশ ও সারাবিশ্বের শ্রমজীবী মানুষকে মে দিবসের অভিনন্দন-শুভেচ্ছা জানাই।

Comments