মহামারিতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চমক!

মহামারিতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চমক!

দীর্ঘদিন ধরে দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানিগুলো দুরবস্থার মধ্যে থাকলেও মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ব্যবসায় বেশ চমক দেখিয়েছে। করোনার প্রকোপ ঠেকাতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের বেশিরভাগ সময় মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ ছিল। ফলে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। অথচ এর মধ্যেও বড় ধরনের মুনাফা করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিকখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রতিষ্ঠানগুলোর সবশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত আটটি প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের আর্থিক তথ্য প্রকাশ করেছে। এর সবগুলোরই মুনাফা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফায় এমন চমকের তথ্য তুলে ধরলেও তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ব্যবসায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তাদের মতে, নানান ছাড়ের কারণে হয়তো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়তে পারে। তারপরও প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে মুনাফা প্রবৃদ্ধির তথ্য দিচ্ছে তা সন্দেহজনক। এখানে আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো কারসাজি করা হচ্ছে কি না তা সংশ্লিষ্টদের ক্ষতিয়ে দেখা উচিত।

নিয়ম অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি তিন মাস পর পর আর্থিক চিত্র প্রকাশ করতে হয়। তারই আলোকে তালিকাভুক্ত ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটি চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) আর্থিক অবস্থাও তুলে ধরেছে।

৩০ আগস্ট পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিডি ফাইন্যান্স, ডিবিএইচ, আইডিএলসি, আইপিডিসি, ইসলামিক ফাইন্যান্স, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল হাউজিং ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্স। এই আটটি প্রতিষ্ঠানের সবগুলোর মুনাফা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফায় সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের। গত বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেড়েছে ৪০৭ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ব্যবসায় কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৭১ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ১৪ পয়সা।

মুনাফায় বড় চমক দেখালেও প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ কমেছে। চলতি বছরের জুন মাস শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৮ টাকা ২৪ পয়সা, যা গত বছরের জুন শেষে ছিল ১৮ টাকা ৭৩ পয়সা। প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সম্পদমূল্য কমেছে ৪৯ পয়সা।

এদিকে শেয়ারপ্রতি সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ডিবিএইচ। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ২ টাকা ৮০ পয়সা যা গত বছর ছিল ১ টাকা ৫৩ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ১ টাকা ২৭ পয়সা বা ৮৩ শতাংশ।

মুনাফা বাড়লেও এ প্রতিষ্ঠানটিরও সম্পদমূল্য কমে গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৭ টাকা ৭৮ পয়সা, যা ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৪১ টাকা ৭২ পয়সা। এ হিসেবে চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য কমেছে ৩ টাকা ৯৪ পয়সা।

শেয়ারপ্রতি সর্বোচ্চ মুনাফার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স। এই প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ২ টাকা ৬১ পয়সা, যা গত বছর ছিল ১ টাকা ৬৮ পয়সা। এ হিসেবে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ৯৩ পয়সা বা ৫৫ শতাংশ।

পরের স্থানে রয়েছে বিডি ফাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ১৭ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৪৪ পয়সা। এ হিসাবে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ৭৩ পয়সা বা ১৬৬ শতাংশ।

বাকি চার প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হলেও অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হওয়ায় অর্থ তারল্য সংকট দেখা দেয়। যে প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ফ্লো যত বেশি ঋণাত্মক, ওই প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট তত প্রকট। একটি প্রতিষ্ঠানের অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়লে ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনায় নানামুখী সমস্যা দেখা দেয়। সময়মতো পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।

ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইপিডিসি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ১১ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৮৫ পয়সা। এ হিসেবে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ২৬ পয়সা বা ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন, এই ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৯২ পয়সা।

ইসলামিক ফাইন্যান্সের শেয়ারপ্রতি অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩ টাকা ৯৩ পয়সা। গত বছরও এই প্রতিষ্ঠানটির অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক ছিল। ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সম্পদমূল্যও কমে গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৭৪ পয়সা, যা গত বছরের জুন শেষে ছিল ১৫ টাকা ১৬ পয়সা। তবে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৪ পয়সা বেড়ে হয়েছে ৭৪ পয়সা।

বাকি দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ন্যাশনাল হাউজিং চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ২৮ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৮০ পয়সা। মুনাফা বাড়লেও এই প্রতিষ্ঠানটিরও সম্পদ কমে গেছে। চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ টাকা ২৭ পয়সা, যা গত বছর ছিল ঋণাত্মক ৩ টাকা ৮ পয়সা। অন্যদিকে শেয়ারপ্রতি সম্পদ ২১ পয়সা কমে ১৭ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

আর ইউনাইটেড ফাইন্যান্স চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৫০ পয়সা, যা গত বছর ছিল ২৭ পয়সা। অন্যদিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি ক্যাশ ফ্লো দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ টাকা ৬৫ পয়সা, যা গত বছর ছিল ঋণাত্মক ৪ টাকা ৬২ পয়সা।

কোম্পানিটির সম্পদেও ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৬১ পয়সা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য ছিল ১৭ টাকা ১১ পয়সা। এ হিসেবে চলতি বছরের ছয় মাসে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সম্পদ কমেছে ৫০ পয়সা।

সম্পদ ও ক্যাশ ফ্লোতে ঋণাত্মক প্রভাব পড়ার পরও মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হওয়ার বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিষয় আছে, যেগুলো পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই আমি মনে করি এগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উচিত নিরপেক্ষ অডিটর দিয়ে পরীক্ষা করা।

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো কারসাজি আছে কি না দেখা দরকার। কারণ দেশের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক না। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না, সেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদের হার আরও বেশি। সুতরাং, তাদের ঋণের প্রবৃদ্ধি খুব একটা বেশি হওয়ার কথা নয়। আর ঋণ দিতে না পারলে লাভও হয় না। এ পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের সূত্র কী, তা দেখা উচিত।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এখন আর্থিক প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, কিছু আয় না হওয়ার পরও তা আয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঠিকভাবে প্রভিশন করতে হচ্ছে না। এ ব্যবস্থা সার্বিকভাবে আর্থিকখাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আর্থিকখাতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, এমন কিছু আয় আছে যেগুলো পাওয়া না যাওয়ার পরও পাওয়া গেছে দেখানো হয়। এটা বড় সমস্যা। অনেকে দেখা যাচ্ছে টাকা পায়নি, কিন্তু পেয়েছে দেখিয়ে দিচ্ছে। আবার এর জন্য প্রভিশন করতে হচ্ছে না। যার ফলে মুনাফা বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সার্বিক পরিস্থিতিতে মুনাফা কমাই স্বাভাবিক। এখন যেসব ছাড় দেওয়া হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তবে যারা ভালো কোম্পানি তারা ঠিকই প্রভিশন রাখছে। যারা ভালো কোম্পানি না, তারা প্রভিশন না রেখে মুনাফা বাড়িয়ে দেখাবে।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও আইপিডিসি ফাইন্যান্সের এমডি মমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার একটা বড় অংশ আসছে শেয়ারবাজার থেকে। কিছু প্রতিষ্ঠান ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। পাশাপাশি আইপিডিসি কিছু ট্রেজারি বড় ছিল সেটা বিক্রি করে আমাদের ভালো মুনাফা হয়েছে। আবার এখন যেহেতু লোন ক্লাসিফাইড করতে হচ্ছে না, সেজন্য প্রভিশন কম করতে হয়েছে। সে ক্ষেত্রে মুনাফা বেশি এসেছে। তবে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি প্রভিশন করেছে। আমাদের (আইপিডিসি) অতিরিক্ত প্রভিশন প্রায় ১২০ কোটি টাকা রাখা আছে।

Comments