মাথা নত করেননি ইমাম হোসাইন (রা.)

মাথা নত করেননি ইমাম হোসাইন (রা.)

১০ মহররম রসুল (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)সহ নবী পরিবারের বহু সদস্য ও সঙ্গীসহ মোট ৭২ জন শাহাদাতবরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ৬১ হিজরির ১০ মহররম শুক্রবার। আজ থেকে ১৩৮২ বছর আগে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রিয় নাতি হজরত হাসানকে (রা.) ভালোবাসতেন নয়নের টুকরা হিসেবে। আল্লাহর রসুল দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ আমি তাকে ভালোবাসি, অতএব তুমিও তাকে ভালোবাস এবং যারা তাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাস।’ বুখারি। আহলে বায়েতের প্রতি ভালোবাসার দ্বারা যে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা অর্জন করা যায় সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। রসুলে খোদা বলেছেন, ‘আল্লাহকে ভালোবাস তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে, আমাকে ভালোবাস আল্লাহর ভালোবাসার জন্য এবং আমার পরিবারকে ভালোবাস আমার ভালোবাসার জন্য।’ তিরমিজি। রসুল (সা.)-এর নাতি হিসেবে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি সব মোমিনের অফুরন্ত ভালোবাসা রয়েছে। কোরআন-হাদিসে আহলে বাইত ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। তাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ ইমানের পরিচায়ক হিসেবেও নির্ধারিত হয়েছে। আহলে বাইতের ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পূতপবিত্র রাখতে।’ সুরা আহজাব, আয়াত ৩৩। সুরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতেও আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদার আভাস দেওয়া হয়েছে। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি আরাফার দিবসে রসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর কাসওয়া নামক উটের ওপর বসে খুতবা দিতে শুনেছি। তিনি বলেন ‘হে মানবসকল! আমি তোমাদের কাছে যা রেখে যাচ্ছি যদি তোমরা এগুলো আঁকড়ে ধর বা প্রতিপালন কর তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তার মধ্যে এক হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং অন্যটি হলো আমার আহলে বাইত।’ রসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে।’ ইবনে মাজাহ।

ইয়াজিদ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। ইয়াজিদ ছিল দুশ্চরিত্র, বেনামাজি ও মদ্যপায়ী। হজরত হাসান ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর খিলাফতের ন্যায়সংগত দাবিদার ছিলেন হোসাইন (রা.)। নীতিজ্ঞানহীন ইন্দ্রিয়পরায়ণ ইয়াজিদের কাছে জীবনের বিনিময়েও হজরত হোসাইন (রা.) মস্তক অবনত করতে রাজি ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন পাপীষ্ঠ ইয়াজিদের বায়াত গ্রহণ করলে ইসলামের গুরুত্ব ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তার দেখাদেখি অন্যান্য অনুসারীও ইয়াজিদের কাছ থেকে বায়াত নেবেন। ইমাম হোসাইন (রা.) অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসীন ইয়াজিদের বায়াত না নিয়ে বাতিলের সামনে মাথা নত না করার অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। কুফাবাসী ইমাম হোসাইন (রা.)-কে চিঠির মাধ্যমে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ইয়াজিদ শাসনের মোকাবিলায় তাঁর হাতে বায়াত নিতে অঙ্গীকার করে বিপুলসংখ্যক চিঠি ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাছে পাঠানো হয়। তারা ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খিলাফতের অধিক যোগ্য, তাঁর জন্য জানমাল কোরবানির জন্য প্রস্তুত এবং আহলে বাইতের অনুরক্ত এমন পয়গাম পাঠায়। তাদের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য হোসাইন (রা.) আপন চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে কুফায় পাঠান। কুফার গভর্নর নুমান বিন বশিরসহ ৪০ হাজার মানুষ মুসলিমের হাতে হোসাইন (রা.)-এর নামে বায়াত নেন। পরিস্থিতি হোসাইন (রা.)-এর অনুকূলে এমন বর্ণনা দিয়ে একজন পত্রবাহককে চিঠি দিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফায় আসতে অনুরোধ করা হয়। কুফাবাসীর অস্থির চিত্তের জন্য ইবনে আব্বাস (রা.)সহ অনেকের বাধা সত্ত্বেও ৬০ হিজরির ৮ জিলহজ পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা দেন। পথিমধ্যে হোসাইন (রা)-এর চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন জাফর সাক্ষাৎ করে মদিনার গভর্নর কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তা সনদের ভিত্তিতে মদিনায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে নানাজির সাক্ষাৎ পেয়েছি। তিনি আমাকে একটি কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলাফল যা-ই হোক না কেন আমি অবশ্যই তা করব আর কাজটি কী সে সম্পর্কে মৃত্যুর আগে আমি কাউকে কিছু বলতে পারি না। ‘জি জাশাম’ নামক স্থানে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের পক্ষ থেকে হুর ইবনে ইয়াজিদ ইমাম হুসাইনের পথ রোধ করে এবং ইমাম কাফেলার সামনে ছাউনি ফেলে। হুর ইবনে ইয়াজিদ ইমাম হোসাইন (রা)-কে তাদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করে। ইমাম হোসাইন (রা.) তাদের সঙ্গে চললেন।

৬১ হিজরির ৯ মহররম বৃহস্পতিবার ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর সঙ্গীসহ কারবালা প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন। হুর ইবনে ইয়াজিদ অবশ্য পরে অনুতপ্ত হয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আনুগত্য ঘোষণা করেন এবং তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হন। কারবালায় অবস্থানরত দ্বিতীয় দিনে আমর ইবনে সাদ ৪ হাজার সেনা নিয়ে ইবনে জিয়াদের পক্ষ থেকে কারবালায় পৌঁছে। ইয়াজিদ বাহনীর পক্ষ থেকে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১০ মহররম ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবার-পরিজন ও সঙ্গীবর্গ নিয়ে জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হন এবং একে একে হোসাইন (রা.)সহ ৭২ জনের সবাই শাহাদাতবরণ করেন। পরিবারের নারী, শিশুসহ বাকি ১২৮ সদস্য বন্দী হন। ১০ মহররম কারবালার ময়দানে ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে যে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা ইমানদারদের জন্য অনুসরণীয়।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক।

Comments