রপ্তানি প্রণোদনা ঘোষণার পর বাড়ল চালের দাম

রপ্তানি প্রণোদনা ঘোষণার পর বাড়ল চালের দাম

গত মাস থেকে চালের দাম একটু একটু করে বাড়ছিল। এর মধ্যে গত সপ্তাহে চাল রপ্তানিতে প্রণোদনার ঘোষণা দেয় সরকার। ফলে চালের দাম বেশ বেড়ে গেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ২ থেকে ৪ টাকা। পাশাপাশি বাড়তি ধানের দামও। তবে দাম বাড়লেও প্রান্তিক কৃষকরা এখনও যৌক্তিক মূল্য পাচ্ছেন না। এই মূল্য বৃদ্ধির সুবিধাভোগী মূলত মিল মালিক, আড়তদার ও ব্যাপারিরা। এদিকে চড়া দামে চাল কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, ধানের দাম বৃদ্ধির কারণে চালের দাম বাড়ছে। তবে বাজারসংশ্নিষ্টরা বলছেন, সরকার রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর পর থেকে মিল মালিকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর পরে ধানের দাম কিছুটা বাড়লেও চালের দাম অনেক বেশি বেড়েছে।

গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক চাল রপ্তানিতে প্রণোদনা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠায়। এতে বলা হয়, চাল রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে প্রথমবারের মতো ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত রপ্তানি করা চালের দামের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এতে আরও বলা হয়, দেশে উৎপাদিত ধান সংগ্রহ করে দেশেই প্রক্রিয়াকরণ করে সেই চাল রপ্তানি করলে ব্যবসায়ীরা ১০০ টাকার বিপরীতে ১৫ টাকা ভর্তুকি পাবে। এ ঘোষণার পরেই দেশের বাজারে প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দাম বেশ বেড়েছে। রাজধানীর মিরপুর-১নং বাজার, কারওয়ান বাজার, টাউন হল ও নিউমার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, খুচরায় কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে চাল বেচাকেনা হচ্ছে। কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে নাহিদের হরিণ ব্র্যান্ডের ভালো মানের নাজিরশাইল ৭২ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে ২ টাকা বেড়ে মানভেদে অন্যান্য নাজিরশাইল চাল ৫০ থেকে ৬৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আর মিনিকেটের দাম কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে মানভেদে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের সপ্তাহে মিনিকেটের কেজি ৪৬ থেকে ৫২ টাকা ছিল। কেজিতে দুই টাকা বেড়ে মোটা (স্বর্ণা ও গুটি) চাল ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা হয়েছে। প্রায় একই হারে বেড়ে বিআর আটাশ, পাইজাম ও লতা (মাঝারি) চাল মানভেদে ৩৮ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর পাইকারি বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী চালের দাম। গতকাল মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে তিতাস এন্টারপ্রাইজের আবদুল মতিন জানান, প্রতি কেজি নাজিরশাইল মানভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের সপ্তাহে ৪৮ থেকে ৬৬ টাকা ছিল। আর ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা কেজি ছিল মিনিকেটের দাম। এটা বেড়ে ৪৮ থেকে ৪৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিআর আটাশসহ মাঝারি মানের চাল ৩২ থেকে ৩৬ টাকা ও মোটা স্বর্ণা ও গুটি ২৭ থেকে ২৯ টাকায় বিক্রি করছেন, যা আগের সপ্তাহে ছিল যথাক্রমে ৩১ থেকে ৩২ টাকা ও ২৬ থেকে ২৭ টাকা। তিনি বলেন, আমনের নতুন সরু চাল নাজিরশাইল ও মোটা চাল গুটি-স্বর্ণা উঠেছে। এর পরও মিলাররা দাম বাড়িয়েছেন। মিলগুলো থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের বলা হচ্ছে, ধান নেই। ঘাটতির কারণে ধানের দাম বাড়ছে। এতে চালের দামও বাড়ছে।

এই বাজারের আরব রাইস এজেন্সির পাইকারি ব্যবসায়ী আক্তারুজ্জামান শাহিন বলেন, সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে। বোরো মৌসুম শেষ হওয়ায় দাম বাড়ছে। আমন ধান বাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এই বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সফিকুজ্জামান বলেন, চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার পরও সরকার রপ্তানির সুযোগ দিয়েছে। এতে মিলগুলো সব ধরনের চালের দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরকারি সংস্থাগুলোও চালের দামের বাড়তির বিষয়টি অস্বীকার করছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে। কেজিপ্রতি মাঝারি ও সরু চালের দাম পাইকারি বাজারে ২ থেকে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা চালের দামও কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে।

এদিকে গত ৩১ অক্টোবর আমন মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছে ২৬ টাকা কেজি দরে ছয় লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ ছাড়া মিলারদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে তিন লাখ ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৫ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২০ নভেম্বর থেকে ধান ও ১ ডিসেম্বর থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করে সরকার। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সংগ্রহ চলবে। যদিও সরকার নভেম্বরে ধান কেনা শুরুর পরে বাজারে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। এর পর মৌসুমে ধানের পর্যাপ্ত সরবরাহ বৃদ্ধির পর দাম কিছুটা কমে আসে। কিন্তু গত মাসে আবারও দাম বেড়ে যায়। এখন রপ্তানি প্রণোদনা ঘোষণার পর নতুন করে আরেক দফা বাড়ল।

এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, রপ্তানি হোক বা নাই হোক; চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সত্যিকার অর্থে রপ্তানি বাড়লে দাম আরও বাড়বে। কৃষকদের কথা চিন্তা করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কৃষকরা এ সুবিধা পাচ্ছেন না। উল্টো ভোক্তারা অসুবিধায় পড়ছেন। এ জন্য রপ্তানি প্রণোদনার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত, যাতে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য মোটা চালের দাম স্থিতিশীল থাকে। এ ক্ষেত্রে চাল রপ্তানি উৎসাহিত করা যৌক্তিক হবে না।

ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির ভূইয়া সমকালকে বলেন, এমনিতেই চালের দাম বাড়ছে। এর পর রপ্তানি সুবিধা দেওয়ায় বাজার আরও বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের ভোক্তাদের কথা বিবেচনা করে এ সুবিধা প্রত্যাহার করা উচিত।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, সরকার রপ্তানিতে প্রণোদনা দিয়েছে, যাতে চালের দাম বাড়ে। কৃষক যাতে ভালো দাম পায়। এক কথায়, চালের দাম বাড়ানোর জন্যই এ প্রণোদনা। দাম না বাড়লে কৃষকরা উৎপাদন কমিয়ে দেবেন। কারণ লোকসান দিয়ে কৃষকরা আবাদ করবেন না। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে ২০০ টন মোটা চাল সোমালিয়ায় রপ্তানি করেছেন। রপ্তানি হওয়ায় কৃষকরা ধান ধরে রেখে ভালো দামে বিক্রি করছেন বলে দাবি করেন তিনি।

আমাদের নওগাঁ প্রতিনিনিধি এমআর ইসলাম রতন বলেন, বর্তমানে ৭০০ থেকে ৭৩০ টাকা মণ ধান বিক্রি করছেন কৃষকরা। সম্প্রতি ধানের দাম মণে ১০০ টাকা বেড়েছে। তিনি বলেন, এক বিঘায় ১২ হাজার টাকা উৎপাদন খরচ লাগে। গড়ে ১৫ মণ ধান উৎপাদন হয়। ফলে এতে লাভ করতে পারছেন না কৃষকরা। আমাদের নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর প্রতিনিধি আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা এখন মোটা ধান ৭০০ টাকা ও সরু ধান ৮৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, যদিও সরকার এক হাজার ৪০ টাকা মণ ধান কিনছেন। মাঠ থেকে না কেনায় কৃষকরা এ দামের সুবিধা পাচ্ছেন না। মিল মালিক ও আড়তদারা কম দামে ধান কিনে সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পদক কেএম লায়েক আলী বলেন, ধানের দাম বাড়ছে; এ কারণে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। রপ্তানি প্রণোদনার কারণে বাড়েনি। আমন মৌসুমের ধান থেকে তেমন রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। বোরো মৌসুম থেকে রপ্তানি বাড়বে। তা ছাড়া বাজারে মোটা চালের দাম সরকারের কেনা দামের কাছাকাছি যায়নি। এ কারণে দাম কিছুটা বাড়তি রয়েছে।

এদিকে দেশের বাজারে চালের দাম বাড়লেও বিশ্ববাজারে চালের দাম কম রয়েছে। এখন ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে প্রতি কেজি চাল আমদানি মূল্য পড়বে ৩৪ থেকে ৪২ টাকা। দেশের বাজারে মানভেদে চাল ৩৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

Comments