১৫ বছর আগে মামুনুল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন

১৫ বছর আগে মামুনুল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হক রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন অন্তত ১৫ বছর আগে। সেই পকিল্পনা বাস্তবায়নে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে তিনি আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পাকিস্তানের একটি সংগঠনকে বেছে নেন। ২০০৫ সালে ভগ্নিপতি মুফতি নেয়ামতউল্লাহর সঙ্গে তিনি ৪৫ দিন পাকিস্তানে অবস্থান করে ওই সংগঠনের মডেল সম্পর্কে দীক্ষা নেন। সেই সংগঠনের আদলে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের নামে যত ধরনের মতাদর্শের মানুষ আছে সবাইকে একই প্লাটফর্মে এনে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। সর্বশেষ ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়ি হিসেবে তিনি হেফাজতে ইসলামকে বেছে নিয়েছিলেন।

রোববার বিকালে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডে থাকা মামুনুল হকের বিষয়ে সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল শাপলা চত্বরে তাণ্ডব থেকে শুরু করে সর্বশেষ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার নেপথ্যে ছিল সরকার উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে বিদেশ থেকে নানা কৌশলে অর্থ সংগ্রহ করতেন মামুনুল। অপকৌশলে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে তিনি এই অর্থ ব্যয় করতেন। মোহাম্মদপুর থানার একটি মামলায় মামুনুল হককে ৭ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

রোববার পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, মামুনুল হককে রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার একটি মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। ওই মোবাইল থেকে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক উচ্চাবিলাসের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে তার ব্যাংক একাউন্ট ও অন্যান্য মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসত। এর মধ্যে কাতার দুবাই, পাকিস্তানও রয়েছে।

তিনি বলেন, বাবরি মসজিদের নাম করে এসব টাকা সংগ্রহ করতেন তিনি।কারণ বাবরি মসজিদের নাম ব্যবহার করলে খুব সহজেই সহানুভূতি পাওয়া যায়। তাছাড়া ভারত বিদ্বেষী মানুষদের কাছ থেকে সহায়তা পেতে তিনি এই কৌশল নেন। এভাবেই তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন। এই টাকা দিয়ে তিনি বিভিন্ন মসজিদ ও কওমী মাদ্রাসায় উগ্র জঙ্গিববাদী কৌশলে বিভিন্ন মানুষকে ম্যানেজ করেছেন।

ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, মামুনুলের আপন ভগ্নিপতি মুফতি নেয়ামতউল্লাহ দীর্ঘদিন পাকিস্তানে ছিলেন। সেখানে ১৫/২০ বছর সেখানে তিনি একটি মাদ্রাসায় ছিলেন। পাকিস্তান থেকে ফিরে নেয়ামমউল্লাহ মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি মামুনুলের বোনকে বিয়ে করেন।

২০০৪ সালে ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন নেয়ামতউল্লার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার পর নেয়ামতউল্লাহ গ্রেফতারও হয়েছিলেন। মামুনুলের হকের বাবা আল্লামা আজিজুল হক (নেয়ামতউল্লার শ্বশুর) ছিলেন চারদলীয় নেতা। তার আনুকূল্যে তখন নেয়ামতউল্লাহ ছাড়া পান। তাজউদ্দিনের সঙ্গেও মামুনুলের যোগাযোগ আছে।

পরের বছর নেয়ামউল্লাহর সঙ্গে মামুনুল পাকিস্তানে গিয়ে ৪৫ দিন অবস্থান করে জানিয়ে ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, পাকিস্তানের একটি ধর্মীয় সংগঠনকে মডেল হিসেবে নিয়ে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন তারা অবস্থান করেন। মূলত নেয়ামউল্লাহ দীর্ঘদিন পাকিস্তানে থাকার কারণে সেই সংগঠনের সঙ্গে লিয়াজো ছিল। তিনিই মামুনুলকে ওই সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। ওই সংগঠনের মডেলে তিনি বাংলাদেশে মওদুদী, সালাফি, হানাফি, কওমী, দেওবন্দী, জামায়াতসহ সকল মতাদর্শের মানুষকে একত্রিত করার চেষ্টা শুরু করেন। লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরোধিতাকারী সংস্থার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ শুরু করেন।

মামুনুলের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের যোগাযোগ আছে জানিয়ে ডিসি বলেন, মানুনুলের আপন ভায়রা কামরুল ইসলাম আনসারী জামায়াতের বড় নেতা। তার বাড়ি টেকেরহাটে। আনসারীর মাধ্যমে মামুনুল জামায়াতের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এমনকি তিনি জামায়াতকে তার বলয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

ডিসি বলেন, মামুনুল হক প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে কটূক্তি করতেন। কোনো কিছুরই তোয়াক্তা করতেন না। তিনি এমনও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কেউ কটুক্তি করলে তিনি ১২ ঘন্টার মধ্যে গুম হয়ে যান। কে গুম হয়েছে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
তিনি মন্ত্রী এমপিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আমার (মামুনুল) দিকে তাকালে চোখ উল্টে ফেলব।’ এগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো রাজনৈতিক কথা বার্তা।’ আবার শাপলা চত্বরে যাবেন, মন্ত্রীদের চোখ উল্টে ফেলবেন- এই ধরনের কথা হেফাজতের মঞ্চে গিয়ে বলেন কেনো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তখন বলার সময় মুখ দিয়ে চলে আসছে।’ বিভিন্ন বক্তব্যের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি।

মামুনুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা পুলিশ হেফাজতে: মামুনুল হকের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ জান্নাত আরা ঝর্ণার বাবা ওলিয়ার রহমানকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানা থেকে তাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

ওলিয়ার রহমান আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন। গত ২১ এপ্রিল বিকালে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তাকে বহিষ্কার করা হয়।

আলফাডাঙ্গা থানার ওসি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ওলিয়ার রহমানকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। হয়তো ডিএমপির ডিবি পুলিশ তাদের মামলার তদন্তের স্বার্থে তার (ওলিয়ার) সঙ্গে কথা বলবে। এর আগে শনিবার রাতে আমরা তাকে থানায় নিয়ে আসি।

Comments